লিনাক্স কেন ব্যবহার করবেন?

লিনাক্স, এক কথায় একটি স্বপ্নের অপারেটিং সিস্টেমের নাম। বিশ্বজুড়ে আজ লিনাক্স মানে স্বাধীনতা, লিনাক্স মানে বিশ্বস্ততা, একাত্মতা। বিশ্বের মানুষ আজ সাদরে লিনাক্সকে গ্রহণ করছে, বাংলাদেশে লিনাক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। হয়তো ভাবতে পারেন, ভালোইতো উইন্ডোজ ব্যবহার করছি, কি দরকার লিনাক্সে যাওয়া? কি দরকার অপারেটিং সিস্টেম বদলানোর ঝামেলা করা? আমি আজ দেখাতে চেষ্টা করব বেশীভাগ উইন্ডোজ ব্যবহারকারী “শান্তিতে নেই”, যদিও আপনি যে শান্তিতে নেই সেটা হয়তো আপনি জানেনও না। লিনাক্স ব্যবহারকারীর অবস্থার সাথে আপনার অবস্থার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

লিনাক্সের ইতিহাস নিয়ে এই পোস্টে আলোচনা করতে চাচ্ছিনা। তবে একটা কথা পরিস্কার করা দরকার। অনেকের লিনাক্স কি আর উবুন্তু-মিন্ট এসব কি এটা নিয়ে পরিস্কার ধারণা নেই। টেকনিকালী লিনাক্স কোনো অপারেটিং সিস্টেম না, লিনাক্স একটি কারনেল(kernel)। আপনি যেসব অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করেন তার সাথে হার্ডওয়্যারের যোগসূত্র তৈরি করে এই কারনেল। কারনেলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে অপারেটিং সিস্টেম। লিনাক্স-কারনেলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে উবুন্তু, মিন্ট, ফেডোরা সহ আরো বেশ কিছু ‘লিনাক্স-ভিত্তিক’ অপারেটিং সিস্টেম। তাহলে বুঝতেই পারছে প্রবন্ধটির প্রথম লাইনটি আসলে টেকনিক্যালি পুরোপুরি ঠিক নয়।

kernel-simple

লিনাক্স-উইন্ডোজ তুলনামূলক চিত্রে সাধারণ ব্যবহারকারি থেকে শুরু করে প্রোগ্রামারদের কাছে প্রথমেই উঠে আসে ভাইরাসের কথা। “ভাইরাস” কথাটি ভাবলেই উইন্ডোজ ব্যবহারকারীদের রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। একের পর এক অ্যান্টিভাইরাস বদল, অরিজিনাল অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যাবহার, কোনো কিছুই শেষরক্ষা করতে পারেনা। পারবে কি করে, ব্যবসা চালাতে অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানিইতো ভাইরাস বানায়! আর আমার মত লিনাক্স ব্যবহারকারীদের ভাইরাসের নাম মনে পড়ে উইন্ডোজ ব্যবহারকারী বন্ধুর সাথে কথা বলতে গিয়ে অথবা এ রকম পোস্ট লিখতে গিয়ে। লিনাক্সের অসাধারণ ফাইল-সিস্টেম ভাইরাসের হাত থেকে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইউন্ডোজের সিস্টেম ফাইলগুলো আসলে বড় অসহায়। আপনি যদি অন্য কারও কম্পিউটার চালু অবস্থায় পান.চাইলেই উইন্ডোজ ফোল্ডারে ঢুকে তার পিসির অবস্থা বারটা বাজিয়ে আসতে পারবেন। আপনি এ কাজ করতে পারলে ভাইরাস বা হ্যাকার কেন পারবেনা? লিনাক্সে সিস্টেম ফাইলগুলোতো সামান্যতম পরিবর্তন করতে পারবেনা কেও আপনার দেয়া পাসওয়ার্ড ছাড়া,চাইলে অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাও করতে পারেন, ভাইরাসের সাধ্য নেই সেই নিরাপত্তা ভেদ করে কিছু করে।
সফটওয়্যারের সোর্সকোডে কিছু নির্দেশ বিশেষ ভাষায় লেখা থাকে। কিছু নির্দেশ এমন হতে পারে:

ডি ড্রাইভে রাখা টেক্সট ফাইলগুলো ওপেন কর।
ফাইলে যা লেখা আছে “সিক্রেট” নামক ফাইলে কপি কর।
সিক্রেট” ফাইলটি হ্যাকার@এবিসি.কম এ মেইল কর।

হ্যা,আপনার সফটওয়্যারে এরকম বা এরথেকে ভয়াবহ নির্দেশও থাকতে পারে। এগুলোকে সফটওয়্যারের ব্যাকডোর(Backdoor) বলা হয়। উইন্ডোজে বা যেসব সফটওয়্যারের সোর্সকোড দেখা যায়না সেসব সফটওয়্যারে ব্যাকডোর থাকলে ধরতে পারা সহজ নয়। লিনাক্সের সব সফটওয়্যার ওপেন সোর্স। আজ আমি যদি একটি সফটওয়্যার বানিয়ে সেটায় এ ধরনের নির্দেশ রাখি তবে কালকেই সেটা অন্য প্রোগ্রামারদের চোখে পড়ে যাবে, তারা সাথে সেটা বদলে দিবে আর আমার কুকীর্তিও ফাস করে দিবে।
এখন বাকিটা আপনার ইচ্ছা। আপনি চাইলে অ্যান্টি-ভাইরাস,অ্যান্টি-মেলওয়্যার নিয়ে ব্যর্থ যুদ্ধে নামতে পারেন, অথবা শুধুমাত্র লিনাক্স ইনস্টল করে ভাইরাস,হ্যাকারদের কাচকলা দেখাতে পারেন।

উইন্ডোজে দরকারী সফটওয়্যার কিভাবে ইনস্টল করেন? এদেশের শতকরা ৯৯ গুগলে সার্চ দিয়ে পাইরেটেড কপি নামায়, আবার গুগলে সার্চ দিয়ে সিরিয়াল,ক্র্যাক ফাইল নামায়, একগাদা নেক্সটে ক্লিক করে, পিসি রিস্টার্ট করে, তারপর ইন্সটল করেতে সক্ষম হয়। সেই সফটওয়্যারটিতে ভালো কাজ না হলে আবার আরেকটির জন্য এই কাজ করে। লিনাক্স ব্যবহারকারী কি করে জানেন? ২টি মাত্র ক্লিক করে সফটওয়্যার সেন্টারে যায়,দরকারী সফটওয়্যারের কি-ওয়ার্ড টাইপ করে (যেমন গ্রাফিক্স,অফিস,গেমস,গণিত,বিজ্ঞান) সাথে সাথে সামনে চলে আসে অনেকগুলো সফটওয়্যারের নাম,কয়েক লাইনে লেখা বর্ণনা পড়ে “ইন্সটল” এ চাপ দেয়, সফটওয়্যার ডাউনলোড হয়ে নিজে নিজে ইন্সটল হয়ে যায়। তারপর মনে মনে ইউন্ডোজ ব্যবহারকারীদের জন্য শোক প্রকাশ করে। অবশ্য প্রয়োজনীয় বেশীভাগ সফটওয়্যার আগেই ইনস্টল করা থাকে যেখানে ইউন্ডোজে এম.এস ওয়ার্ড এর মত দরকারী জিনিস কষ্ট করে ইনস্টল করতে হয় (তাও চোরাই ভার্সন)। একটি মাত্র ক্লিকে লিনাক্সের সব সফটওয়্যার একবারে আপডেট করা যায়।

আপনার ইউন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম কতটা স্থিতিশীল? সেভেন আসার পর উইন্ডোজ অবশ্য অনেকটাই স্থিতিশীল হয়েছে, তার আগের ভার্সনগুলোর অবস্থা বেশ খারাপ। তবে লিনাক্সের মত স্থিতিশীল আর কিছু নেই। লিনাক্স হ্যাং বা ক্র্যাশ করেনা বললেই চলে। কোনো সফটওয়্যার উল্টোপাল্ট ব্যবহার করলে সেটা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়া যায়। ফলে কম্পিউটার রিস্টার্টের দরকার হয়না বললেই চলে। এক বছর টানা কম্পিউটার চালু রেখেছে, রিস্টার্টের দরকার ছাড়াই এমন উদাহরণ অনেক, সার্ভার পিসিতে লিনাক্স প্রথম পছন্দ হবার একটি কারণ এটি।

স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে উইন্ডোজ ব্যবহারকারীদের ঘন ঘন রি-ইনস্টল করার কষ্টের কথা না বললেই নয়। বাজে ফাইল সিস্টেম আর ভাইরাসের কারণে দিন দিন উইন্ডোজ স্লো হতে থাকে,আপনি যতই যত্ন করুননা কেন। উইন্ডোজ ব্যবহার করার সময় ডিফ্র্যাগমেন্টার, রেজিস্ট্রি ক্লিনার আরও কতকি ব্যবহার করতাম, কিন্তু ৩ মাসের আগেই পিসি কচ্ছপে পরিণত হত (গেম খেললে গতির পরিবর্তন আরো বড় হয়ে ধরা দেয়)। আবার রিস্টার্ট দেয়ার কয়দিন পর আবার সেই একই কাহিনী। লিনাক্স ব্যবহারকারীরার এদিক থেকে অলস, তারা কিছুতেই এসব ঝামেলায় যায়না। লিনাক্স ইন্সটল করতে ১০-১৫ মিনিট লাগে, এরপর আর কোনো কাজ থাকেনা।

উইন্ডোজ রি-সেটআপ করার পর শুরু হয় আরেক যন্ত্রণা। সব সফটওয়্যার আবার ইন্সটল কর, ড্রয়ার থেকে ড্রাইভারের সিডি বের করে ইন্সটল কর,আরো কত কি। লিনাক্সে অপারেটিং সিস্টেমের সাথে ইন্সটল হয় ওপেন অফিস, ফটোশপের সমতুল্য গিম্প, ইন্সট্যান্ট ম্যাসেনজার,ফায়ারফক্স,পিডিএফ রিডার,ডিকসনারী,ডাউনলোডার,টরেন্ট সফটওয়্যার, জিপ ফাইল ওপেনার সাথে আরো বেশ কিছু অতি প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার। এখন অভ্রও লিনাক্সে কাজ করে। ওয়াইন নামক অ্যাপ্লিকেশনের সাহায্য লিনাক্সে ইউন্ডোজের গেমসও খেলা যায়।

অনেক সফটওয়্যার উইন্ডোজের স্টার্ট মেনুর চেহারা হয় আমার টেবিলের থেকেও অগোছালো। সেগুলোকে অাদ্যাক্ষর অনুযায়ী সাজানো যায়, আর তাতে লাভ হয় প্রায় শূণ্য। লিনাক্সে স্টার্ট মেনু নেই। বদলে যে মেনু আছে তার চেহারা আমার মা ঘর গুছিয়ে দেবার পর ঘরের যে সুন্দর চেহারা হয় সেরকম। মেনুটি গ্রাফিক্স,অফিস, গেমস,প্রোগ্রামিং এরকম ১০-১২ ভাগে ভাগ করা আর সেগুলোর ভিতর দরকারী সফটওয়্যার সাজানো। উইন্ডোজ এ এই কাজটি ম্যানুয়ালি করতে হয়, এখানে একাই হয়ে যায়।
আপনার উইন্ডোজের ডেস্কটপ এর চেহারা কেমন এখান থেকেই অনুমান করা যায়। যে থিমই ইন্সটল করেন চেহারা খুব বেশী পাল্টাবেনা। প্রবেশ করতে চান পরবর্তী প্রজন্ম ডেস্কটপে? আসুন লিনাক্সে। ভিস্তা, সেভেনের সব ইফেক্ট মলিন হয়ে যায় লিনাক্সের থ্রি-ডি ডেস্কটপের সামনে। এই ভিডিওটি দেখুন,আপনার চক্ষু চরকগাছে উঠবে । অবশ্য এরকম ইফেক্টের জন্য রিসোর্স বেশী লাগে।

তবে লিনাক্সের এত সুবিধা দেখে যদি মনে করেন পুরোনো পিসিতে লিনাক্স চলবেনা, তাহলে ভূল হবে। উবুন্তু-মিন্ট এর সবথেকে নতুন ভার্সনও পুরোনো যেকোনো পিসিতে সমস্যা ছাড়াই চলবে। পুরোনো পিসিতে সেভেন,ভিস্তা বা ওয়ার্ড ২০০৭ ইনস্টল করে দেখুনতো কেমন মজা!

আশা করি কয়েকজনকে হলেও লিনাক্স ব্যবহারে আগ্রহী করতে পেরেছি। লিনাক্স এখন খুবই ইউজার-ফ্রেন্ডলী, নতুনদের মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হবেনা। ইনস্টল না করেও সিডি দিয়ে লিনাক্স ব্যবহার করে দেখে নিতে পারেন। ইনস্টল করা খুবই সহজ, সময়ও লাগে অল্প। তবে নতুন ব্যবহারকারীদের বলব যতদিননা লিনাক্সে অভ্যস্থ হচ্ছেন ডুয়েল বুট করে উইন্ডোজও রাখতে। কয়েকদিন পর আপনিই আর উইন্ডোজের দিকে তাকাবেননা।

যখন নিরুপায় ছিলাম তখন নাহয় পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করেছি,কিন্তু এক সুন্দর বিকল্প থাকতে কেন আমরা চুরি করব? কম্পিউটার বিশ্ব আজও মাইক্রোসফট নামক অসাধারণ কোম্পানিটির আধিপত্য। মাইক্রোসফটের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ,তারাই প্রথম কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের দ্বারে এনে দিয়েছে। কিন্তু তাদের সফটওয়্যার চুরি করার থেকে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার করাই কি ভালো নয় যেখানে সেটি কোনো ক্রমেই কম শক্তিশালী নয়? বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসম্ভব প্রতিভাবান সব কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের মেধায়,ভালবাসায় তৈরি হয়েছে এসব ফ্রি সফটওয়্যার,বিভিন্ন ফোরামে তারা তৈরি যেকোনো সমস্যায় আপনাকে সাহায্য করতে, এজন্যই শুরুতে বলেছি লিনাক্স মানে একাত্মতা। একসময় লিনাক্স ছিল শুধু প্রোগ্রামারদের জন্য, আজ লিনাক্স সব মানুষের জন্য। About Ubuntu তে চাপ দিলে লেখা ভেসে উঠে Ubuntu: Linux For Human Being, এর থেকে সার্থক কথা আর কিছ হতে পারেনা।
আসুন আমরা মাথা উচু করে দাড়াই, “বাংলাদেশ চোরাই সফটওয়্যার ব্যবহারকারীদের দেশ” এ ধরণের অপবাদ থেকে আমরা বেরিয়ে আসি। লিনাক্স ব্যবহার করুন,ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে।

বেশ কিছু ওয়েবসাইট ঘুরে প্রবন্ধটি লিখেছি। এদের মধ্যে আছে:

http://www.whylinuxisbetter.net/

http://www.desktoplinux.com/articles/AT5836989728.html

http://en.wikipedia.org/wiki/Linux

http://en.wikipedia.org/wiki/Kernel_%28computing%29

Unix Shell Programming By Yashavant P.Kanetkar